করোনা ইফেক্ট | Corona effect | করোনা লস | করোনা সংঘটন

0
101
করোনা ইফেক্ট

প্রিয় পাঠক আজকে আমরা ট্রান্সমিশন লাইনে যে হিস হিস আওয়াজের সৃষ্টি হয় যাকে করোনা ইফেক্ট বলে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

করোনা ইফেক্ট ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রিক্যাল প্রোপার্টি, যা নির্দিষ্ট লাইন ভোল্টেজের অতিক্রান্তিতে সংঘটিত হয়। করোনার কারণে পাওয়ার লস হয় বিধায় ট্রান্সমিশন দক্ষতাও লক্ষণীয় মাত্রায় হ্রাস পায়। তাছাড়া তার ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় লাইনের আয়ুষ্কাল তুলনামূলক কমে যায়। উপরন্তু করোনা জনিত হারমোনিক কারেন্ট উদ্ভব হওয়ায় লাইনে চার্জিং কারেন্ট বেড়ে যায় এবং নিকটস্থ টেলিকমিউনিকেশন লাইনে অবাঞ্ছিত শব্দদূষণ সৃষ্টি হয়। লাইন তার ময়লাযুক্ত অমসৃণ হলে কিংবা ঝড়-বাদলের সময় করোনার বিরূপ প্রভাব লক্ষ করা হয়। একারণে লাইন ডিজাইনের সময় যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, যাতে করোনার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে লাইনকে রক্ষা করা যায়।

ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইনে করোনা

দুটি কন্ডাকটরের আড়াআড়িতে এসি সাপ্লাই প্রয়োগ পূর্ব ধীরে ধীরে বাড়ানো হলে এমন এক পর্যায় আসে, যখন ভোল্টেজ নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে। একে creitical disruptive voltage বলে। এ সময় কন্ডাক্টরের চতুষ্পার্শ্বস্থ বাতাস আয়োনাইজড হয় এবং কন্ডাকটরের চারদিকে হিসহিস শব্দে একটি ঈষৎ অনুজ্জ্বল বেগুনী আভা ডিসচার্জ হতে দেখা যায়, একে করোনা ডিসচার্জ বলে। করোনা সংঘটনের দরুন ক্ষতিকর ওজন গ্যাস, পাওয়ার লস এবং রেডিও ইন্টারফারেন্স উদ্ভব হয়। ভোল্টেজ বৃদ্ধির পরিমাণ অনুযায়ী এগুলো কমবেশি হয়। যাহোক প্রয়োগকৃত ভোল্টেজ বাড়িয়ে যদি ব্রেকডাউন মানে উন্নীত করা যায়, তাহলে এয়ার ইনসুলেশন ভেঙে যাওয়ায় কন্ডাকটরদ্বয়ের মধ্যে প্রজ্জ্বলিত ফ্লাশ ওভার সংঘটিত হয়। সুতরাং উপরোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে সংক্ষেপে করোনাকে নিম্নরূপে সংজ্ঞায়িত করা যায়ঃ “ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইনে সৃষ্ট বেগুনি আভা, হিস হিস শব্দ এবং ওজন গ্যাসের সম্মিলিত সংঘটনকে করোনা বলে।

বিশ্লেষণঃ বাতাসে সবসময় আয়োনাইজেশনের কারণে কিছু পরিমাণ কসমিক রশ্মি, আল্ট্রা-ভায়োলেট রশ্মি, রেডিও অ্যাকটিভিটি ইত্যাদির উপস্থিতি বিদ্যমান। স্বাভাবিক অবস্থায় কন্ডাকটরের চারপার্শ্বে মুক্ত ইলেকট্রন, পজিটিভ আয়ন এবং নিউট্রন মলিকিউল থাকে, যখন কন্ডাকটরদ্বয়ের আড়াআড়িতে ভোল্টেজ প্রয়োগ করা হয় তখন পটেনশিয়াল গ্রেডিয়ান্টের উৎপত্তি হয়। কন্ডাকটরের সারফেসে এর মান সর্বোচ্চ হয়ে থাকে। এই পটেনশিয়াল গ্রেডিয়েন্টের কারণে মুক্ত ইলেকট্রনগুলি যথেষ্ট বেগপ্রাপ্ত হয় এবং এর বেগ গ্রেডিয়ান্টের বৃদ্ধির সাথে বৃদ্ধি পায়।


করোনা ইফেক্ট প্রতিক্রিয়া সমূহ

  1. কন্ডাকটরের চারপার্শ্বে বেগুনি রশ্মি দেখা যায়।
  2. করোনা হিসিং আওয়াজ এর সৃষ্টি করে।
  3. ওজোন গ্যাসের সৃষ্টি করে। তিনটি অক্সিজেন পরমাণু নিয়ে গঠিত ওজোন গ্যাসটি নীলাভ বেগুনি রং এর ও মাছের মতো আঁশটে গন্ধযুক্ত।
  4. খসখসে, অমসৃণ ও ময়লাযুক্ত নিবারণ তারে বেগুনি আলোক রশ্মি বেশি দেখা দেয়।
  5. করোনা পাওয়ার লসের সৃষ্টি করে থাকে।
  6. করোনা হারমনিকস কারেন্টের সৃষ্টি করে ফলে চার্জিং কারেন্টের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

করোনাকে প্রভাবিত করার ৪ টি বিষয়

আবহাওয়ামন্ডলঃ আবহাওয়ার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর করোনা নির্ভরশীল। কন্ডাকটরগুলি চারপার্শ্বে বাতাসের আয়োনাইজেশনের ফলে করোনার উৎপত্তি হয়ে থাকে।
কন্ডাকটর সাইজঃ কন্ডাকটরের আকৃতি এবং অবস্থার উপর করোনা নির্ভর করে। যেমন কন্ডাকটর সার্ফেস খসখসে ময়লা ও অমসৃণ হলে করোনা বৃদ্ধি পায়। কারণ বক্র তলে ব্রেক ডাউন ভোল্টেজের মান কমে যায়।
কন্ডাকটরের মধ্যে দূরত্বঃ কন্ডাকটর স্থাপনের উপর করোনা নির্ভর করে। কন্ডাকটরের ব্যাসের তুলনায় পরিবাহী সমূহের মধ্যবর্তী স্পেসিং কম হলে করোনার উৎপত্তি বৃদ্ধি পায়।
লাইন ভোল্টেজঃ লাইন ভোল্টেজ করোনাকে বিশেষভাবে এফেক্ট করে। লাইন ভোল্টেজ কম হলে কন্ডাকটরের চারপার্শ্বে বাতাসে কোন প্রভাব পড়ে না, ফলে করোনার এফেক্ট আসেনা। কিন্তু ভোল্টেজ বৃদ্ধি পেয়ে যদি এরূপ মানে উপনীত হয়, যাতে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক স্ট্রেসের উদ্ভব হয়ে কন্ডাকটরের আশেপাশে বাতাসের ডাই-ইলেক্ট্রিক স্ট্রেংথ নষ্ট হয়ে যায় তাহলে করোনার উৎপত্তি হয়।

করোনার সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ

করোনার কিছু সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইনের সঠিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার।

সুবিধাসমূহঃ
  • সার্জ ভোল্টেজের ফলে সৃষ্ট ট্রানজিয়েন্ট ইফেক্টকে করোনা সীমিত রাখে বলে সুইচ গিয়ারের সেফটি ভালব হিসাবে কাজ করে।
  • করোনার কারণে কন্ডাকটরদ্বয়ের মধ্যে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক স্ট্রেসের মান হ্রাস পেয়ে থাকে, কারণ এ সময় কন্ডাকটরের চারপাশের বাতাস পরিবাহী হিসাবে কাজ করে এবং কন্ডাকটরের ভারচুয়াল ব্যাস বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।



অসুবিধসমূহ
  1. করোনার কারণে শক্তি বা পাওয়ার অপচয় হয় ও ট্রান্সমিশন দক্ষতা হ্রাস পায়।
  2. লাইনে ক্ষতিকর ওজোন গ্যাসের সৃষ্টি হয়, ফলে কেমিকেল রিয়্যাকশন হয়ে কন্ডাকটর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
  3. করোনার জন্য লাইনে নন-সাইনোসয়ডাল ভোল্টেজ ড্রপ হয় যা নিকটবর্তী কমুনিকেশন সার্কিটে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক এবং ইলেকট্রোস্ট্যাটিক ইন্ডাকশনের কারণে অসুবিধার সৃষ্টি হয়।
  4. ডিসচার্জের সময় বাতাসের ডাই-ইলেকট্রিক স্ট্রেসের মান কমিয়ে দেয়।
  5. সৃষ্ট ওজোন গ্যাস সাব-স্টেশন, সুইচগিয়ার ও অন্যান্য ধাতব যন্ত্রপাতিকে ক্ষয় ও অক্সাইডের আবরণ সৃষ্টি করে।
  6. করোনা ডিসচার্জের সময় ভংগুর আওয়াজের সৃষ্টি হয় যা বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কোর, নাট, বোল্ট, জয়েন্ট ইত্যাদি যে কোন বড় ধরনের ব্রেক ডাউন করতে থাকে।
  7. করোনার কারণে লাইনে প্রচুর হার্ড হারমোনিক্সের সৃষ্টি হয়।

করোনা লস কমানোর উপায়

কন্ডাকটর সাইজ বৃদ্ধি করেঃ এই পদ্ধতিতে কন্ডাকটর সাইজ অর্থাৎ ব্যাস বাড়ানো হয়। কন্ডাকটরের সাইজ বৃদ্ধির সাথে সাথে করোনা সংঘটিত হওয়ায় ভোল্টেজও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। ফলে কার্যত করোনা এফেক্ট কমে। ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইনে এজন্য বৃহৎ প্রস্থচ্ছেদ বিশিষ্ট এ.সি.এস.আর (ACSR) কন্ডাকটর ব্যবহার করা হয়।
কন্ডাকটর স্পেসিং বৃদ্ধি করেঃ কন্ডাকটর স্পেসিং একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বৃদ্ধি করা হয়। ফলে করোনা হওয়ার জন্য সংঘটিত ভোল্টেজও বৃদ্ধি পেয়ে কার্যত করোনা এফেক্ট কমে। কন্ডাকটর স্পেসিং খুব বেশি বৃদ্ধি করা যায়না, কারণ এতে ইনসুলেটর, ক্রস-আর্ম, স্ট্রাকচার ইত্যাদির খরচ বৃদ্ধি পায়।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য ত্যাগ করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন।
দয়া করে, আপনার নাম এখানে লিখুন