আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় সোলার পাওয়ার প্লান্ট বা সোলার এনার্জি বা সৌরশক্তি।

সােলার পাওয়ার প্লান্ট বা সৌর শক্তি বা সোলার এনার্জিঃ

সূর্য অপরিসীম শক্তির আধার। এ শক্তির ব্যবহার বিপুল পরিমাণ বিনিয়ােগ ছাড়াই সারাদেশে বিশেষ করে জাতীয় গ্রীড আওতা বহির্ভূত প্রত্যন্ত এলাকাসমূহে বিদ্যুৎ শক্তির উৎপাদন এবং
সঞ্চালন সম্ভব। বিষুব রেখা থেকে পৃথিবীর উপর 15° ও 35° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ কৌণিক দূরত্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সৌর শক্তি বা সােলার এনার্জি পাওয়া যায়। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ এ দুয়ের মধ্যে অবস্থিত। অতএব বাংলাদেশ সােলার এনার্জির জন্য অত্যন্ত উপযােগী। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ও পাহাড়ি এলাকায় সােলার এনাজির পরিমাণ নিরূপণ করার লক্ষ্যে আই এফ আর ডি ক্যাম্পস (ঢাকা)-এ একটি ও বান্দরবানের।

শৈলপ্রপাত এলাকায় একটি অত্যাধুনিক সােলার রেডিয়েশন মাপক যন্ত্র শ্যাডােব্যান্ড পাইবানােমিটার বসানাে হয়েছে। আগস্ট, 1999 থেকে এপ্রিল, 2008 পর্যন্ত উক্ত শ্যাডােব্যান্ড পাইরানােমিটারসমূহের সাহায্যে সােলার রেডিয়েশনের বিভিন্ন উপাত্ত তথ্য সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে কম্পিউটারের মাধ্যমে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে অভ্যন্তরীণ এলাকার চেয়ে পাহাড়ি এলাকায় গড়ে সৌর শক্তির পরিমাণ কিছুটা বেশি। এর কারণ হচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের তারতম্যের জন্য। উপরােক্ত সময়ের মধ্যে সংগৃহীত বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে।

যে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রতি বর্গমিটারে 1323 থেকে 1472 কিলােওয়াট আওয়ার সােলার এনার্জি পাওয়া যায় যা ইউরােপের চেয়ে 50-70% বেশি এবং মরু এলাকার চেয়ে মাত্র 25-30% কম। এই বিপুল পরিমাণ সােলার এনার্জি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সােলার এনার্জির বহুবিধ ব্যবহার :
(১) সৌরচুল্লি বা সােলার ওভেন।
(২) সৌর বিদ্যুৎ
(৩) সােলার ওয়াটার হিটার।
(৪) সােলার ড্রায়ার।
(৫) সৌর বিশুদ্ধকরণ।

(ক) ডিশ টাইপ সৌরচুল্লিঃ

ডিশ টাইপ সৌরচুল্লির প্রধান দুটি অংশ

(ক) 99 সেমি. ব্যাস থেকে 112 সেমি. ব্যাস বিশিষ্ট অধিবৃত্তকার অ্যালুমিনিয়াম প্রতিফলক এবং এমএস রড ও পাইপের তৈরি প্রতিফলকের রিং।
(খ) প্রতিফলকটি দাড় করিয়ে রাখার স্ট্যান্ড বা দণ্ড।

ব্যবহার বিধি : প্রথমে সৌরচুল্লিটি একটি সমতল জায়গায় স্থাপন করতে হবে। প্রতিফলকটি স্ট্যান্ডের উপর এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যেন প্রতিফলিত সূর্যরশ্মি সম্পূর্ণভাবে পাত্রের তলায় পতিত হয়। যে পাত্র দিয়ে রান্না হবে সে পাত্রের তলা অবশ্যই কালাে রং করে দিতে হবে। এ ধরনের সৌরচুল্লি দিয়ে প্রত্যহ 5/6 সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের দুপুরের রান্না করা যায় ।

ব্যবহারের সুবিধাসমূহ :
(ক) জ্বালানি খরচ মােটেও লাগে না।
(খ) সব ধরনের রান্না করা যায়।
(গ) পরিবেশ দূষণ রােধে সাহায্য করে ।

সীমাবদ্ধতাসমূহ :
(ক) বৃষ্টির দিনে রান্না করা যাবে না।
(খ) রৌদে দাঁড়িয়ে রান্না করতে হয়।
(গ) ঘন ঘন সূর্য ট্র্যাকিং এর প্রয়ােজন হয়।

(খ) বক্স টাইপ সৌরচুল্লিঃ

দেখতে এটা একটা চারকোনা বাক্সের মত। এ বাক্সের তলদেশে ও চারপাশে রয়েছে তাপনিরােধক ব্যবস্থা। ধাতব পাত্রের তৈরি একটি ট্রে রাক্সের ভিতরে স্থাপন করা হয় । সূর্যরশ্মি শােষণের জন্য ট্রে টি কালাে রং করা হয় এবং বাক্সের উপরের দিকটা কাচ দিয়ে ঢেকে দেয়া থাকে। আপতিত সূর্য রশ্মির পরিমাণ বাড়ানাের জন্য বাক্সের উপরে একটি অ্যালুমিনিয়াম শিটের তৈরি প্রতিফলক ব্যবহার করা হয়। রানার সময় এই প্রতিফলকটি সূর্যের দিকে মুখ করে রাখা হয়।

কার্যকারিতাঃ 51 সেমি. x 51 সেমি. মাপের একটি ওভেনে 5/6 জন সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের জন্য চাল, ডাল, মাংস বা মাছ ইত্যাদি রান্না করা যায়। এ রান্না কাজ সম্পন্ন হতে 2 থেকে 3 ঘণ্টা সময় লাগে। এছাড়া কেক, পুডিং ইত্যাদি প্রস্তুত করা যায়।

সৌরচুল্লির সুবিধাসমূহ :
(ক) জ্বালানি খরচ মােটেও লাগে না।
(খ) খাদ্যের মান অক্ষুন্ন থাকে।
(গ) রান্নার জন্য গৃহিনীকে কম সময় ব্যয় করতে হয়।
(ঘ) খাবার বেশি সময় গরম রাখা যায়।
(ঙ) পরিবেশ দূষিত হয় না।।

সৌরচুল্লির সীমাবদ্ধতাসমূহ :
(ক) কোন প্রকার ফ্রাইং বা রােস্টিং করা যায় না।
(খ) মেঘলা দিনে রান্না বিলম্বিত হয়।

সৌর বৈদ্যুতিক প্রয়ােগের চারটি অংশ

সৌর বিদ্যুৎ : সূর্যের আলােকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করার ব্যবস্থাই সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় মূলত চারটি অংশ থাকে। যেমন :

(১) সােলার প্যানেল : এটাই মূলত জেনারেটর যার মাধ্যমে সূর্যের আলাে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। সােলার প্যানেল খুঁটি বা ঘরের চালে লাগাতে হয় যাতে করে সরাসরি সূর্যের আলাে প্যানেলের উপর পড়ে। অন্যান্য যন্ত্রাংশ ঘরের ভিতরে থাকবে। প্রয়ােজন অনুযায়ী বিভিন্ন মাপের সােলার প্যানেলে লাগিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানাে হয়।

(২) ব্যাটারি : যার মধ্যে রূপান্তরিত বিদ্যুৎ জমা করে রাখা হয় ।

(৩) চার্জ নিয়ন্ত্রক : যা ব্যাটারির মধ্যে বিদ্যুতের চার্জের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাটারির জীবনকাল সংরক্ষণ করা হয় ।

(8) লােড : উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক সামগ্রী, যেমন : বাতি, টিভি, ক্যাসেট, ফ্যান, ফোন, কম্পিউটার, সেচের জন্য পাম্প ইত্যাদি।

সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার : বর্তমান বিশ্বে সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গৃহ বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ জনসাধারণ কেরােসিন বাতির চেয়ে বিদ্যুতায়নের
প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। নিম্নে সৌর বিদ্যুতের বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্যবহার দেয়া হলাে :

(১) ঘরবাড়ি, দোকানপাট, অফিস, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও মসজিদ আলােকিত করা যায় ।
(২) রেডিও, ক্যাসেট, টিভি চালানাে যায় ।
(৩) ছােট ফ্যান চালানাে যায়।
(৪) কম্পিউটার চালানাে যায়।
(৫) সেলুলার ফোন চালানাে যায়।
(৬) ডিসি মােটর চালিত যে কোন যন্ত্রপাতি যেমন : ফ্যান, ড্রিল মেশিন, পাম্প ইত্যাদি চালানাে যায়।

সৌর বিদ্যুতের সুবিধাসমূহ :
(১) নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মালিক হওয়া যায়।
(২) কোন বিল দিতে হয় না।
(৩) 20 বছর স্থায়িত্ব থাকে।
(৪) কোন প্রকার লােড শেডিং হয় না।
(৫) কোন জ্বালানি খরচ নেই।
(৬) এর স্থায়িত্ব যথেষ্ট ভালাে।
(৭) দেশের যে কোন স্থানে একে স্থাপন করা যায়।
(৮) পরিবেশ ভাল থাকে।

সোলার পাওয়ার প্লান্ট 

সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক কার্যক্রমের লক্ষ্যে বিসিএসআইআর-এর জ্বালানি গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি গবেষণা ও উন্নয়নে উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে একটি 220 ওয়াটের সােলার পাম্প, 250. ওয়াটের সােলার পিভি সিস্টেম (প্রতিটি 50 ওয়াট করে মােট 5টি), মেঘনাঘাট এলাকার গজারিয়া থানাধীন একটি গ্রামে মােট 400 ওয়াটের সােলার পিভি সিস্টেম (প্রতিটি 50 ওয়াট করে মােট ৪টি), বান্দরবানের শৈলপ্রপাত এলাকার একটি বাড়িতে 106 ওয়াট সােলার পিভি সিস্টেম বসানাে হয়েছে। পরীক্ষামূলক এ সকল সােলার পিভি সিস্টেমসমূহ বসানাের মাধ্যমে গ্রামীণ জগনণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা পরীলক্ষিত হয় এবং জনগণ খুবই আশা করছে যে গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকায় এর ব্যাপক প্রসার লাভ করুক।

রেফারেন্সঃ জেনারেশন অব ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি

Facebook Comments