সিনক্রোনাস মোটর পরিচালনা

প্রিয় পাঠক আজকে আমরা সিনক্রোনাস মোটর পরিচালনা কিভাবে করতে হয় সে সম্পর্কে জানবো। আমরা যারা ফ্রেশ ইঞ্জিনিয়ার তারা নতুন কোন কারখানায় গেলে সিনক্রোনাস মোটর পরিচালনা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে অসুবিধায় পড়তে পারি। তাই যেন অসুবিধা না এইজন্য এই লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইল।

সিনক্রোনাস মোটর (Define Synchronous Motor)

লােড পরিবর্তনের সাথে যে মােটরের গতিবেগের কোন পরিবর্তন হয় না অর্থাৎ যে মােটর সর্বদা একটি নির্দিষ্ট গতিবেগে ঘুরে তাকে সিনক্রোনাস মােটর বলে ।” এই নির্দিষ্ট গতিবেগ যা মােটরের ফিকয়েন্সি (f) এবং পােলসংখ্যা (P) এর সাথে সম্পর্ক যুক্ত একে সিনক্রোনাস গতিবেগ বলে। সিনক্রোনাস মােটরের সিনক্রোনাস গতিবেগ-

Ns=120f/P

এখানে N হলাে প্রতিমিনিটে মােটরের ঘূর্ণন সংখ্যা f এবং P হলাে সরবরাহ ভােল্টেজের ফ্রিকুয়েন্সি এবং পােলসংখ্যা। সিনক্রোনাস মােটরের সংজ্ঞা নিম্নলিখিতভাবে ও দেওয়া আছে। “যে মােটর সিনক্রোনাস গতিবেগে ঘুরে তাকে সিনক্রোনাস মােটর বলে।” সিনক্রোনাস গতিবেগে চলে বলে, এই মােটরের স্পিড রেগুলেশন শূন্য।

গঠনগত দিক দিয়ে সিনক্রোনাস মােটর এবং অল্টারনেটরের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। অল্টারনেটরের মত সিনক্রোনাস মােটরের রােটরে বা ফিল্ডে ডিসি সরবরাহ দেওয়া হয়।অল্টারনেটরের ফিল্ডকে ঘুরালে আর্মোচার বা
স্টেটরে A.C ভােল্টেজ উৎপন্ন হয়। কিন্তু সিনক্রোনাস মােটরের রােটর না ঘুরিয়ে স্টেটরে 3-0 এসি সরবরাহ দিলে স্টেটরের যে ঘুরন্ত চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হয় তা রেটের ডিসি ফিল্ডের সাথে ক্রিয়া করে ফলে রােটরে টর্ক উৎপন্ন হয় এবং রােটর ঘুরে । অল্টারনেটরের ফিল্ড এক্সাইটেশন পরিবর্তন করলে আর্মেচার বা স্টেটরের উৎপন্ন ভােল্টেজের পরিবর্তন হয় । কিন্তু সিনক্রোনাস মােটরের রােটরের এক্সাইটেশন পরিবর্তন করে একে আন্ডার এক্সাইটেশনে ল্যাগিং, ওভার এক্সাইটেশনে লিডিং এবং নরমাল এক্সাইটেশনে ইউনিটি পাওয়ার ফ্যাক্টরে পরিচালনা করা যায়। সিনক্রোনাস মোটর

এখানে উল্লেখ্য যে সিনক্রোনাস মােটরের লােড পরিবর্তনের মুহূর্তে এর গতিবেগের সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তবে আপনা আপনি
এসি সাের্স হতে পাওয়ার সমন্বয় করে পুনরায় সিনক্রোনাস গতিবেগে ঘুরতে থাকে। অল্টারনেটরের রােটর স্যালিয়েন্ট এবং নন স্যালিয়েন্ট উভয় প্রকারের হয়ে থাকে। তবে সিনক্রোনাস মােটরের রােটর সর্বদা স্যালিয়েন্ট পােল টাইপ হয়ে থাকে। গঠনের দিক থেকে সিনক্রোনাস মােটরের প্রধান প্রধান অংশগুলাের মধ্যে স্টেটর, রােটর, এক্সাইটার, স্নিপ-রিং ও
কার্বন ব্রাশ এবং ড্যাম্পার ওয়াইন্ডিং ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। সিনক্রোনাস মোটর পরিচালনা

(১) স্টেটর ও রােটর (stator and Rotor):

মােটরের স্টেটরটি হুবহু অল্টারনেটর স্টেটরের অনুরূপ, যার মধ্যে তিন ফেজ ওয়াইন্ডিং বসানাের ব্যবস্থা থাকে। স্টেটর ওয়াইন্ডিং-এ বাইরে থেকে তিন ফেজ সরবরাহ প্রয়ােগ করা। হলে স্টেটরে নির্দিষ্ট সংখ্যক পােল সৃষ্টি হয়ে সিনক্রোনাস গতিবেগ সম্পন্ন একটি নির্দিষ্ট চুম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। রােটর সাধারণত স্যালিয়েন্ট-পােল ধরনের হয়ে থাকে। ওয়াইন্ডিং বাইরের এক্সাইটার থেকে কার্বন ব্রাশ ও স্নিপ-রিং এর মাধ্যমে ডি.সি, সরবরাহ পায়। এ ডি.সি. সরবরাহের সাহায্যে রােটরে সমান সংখ্যক পােল উৎপন করা হয়, যেগুলাে অবশ্যই অপরিবর্তনশীল।

(২) প্রাইম মুভার ও এক্সাইটার (Prime Mover & Exciter):

সিনক্রোনাস মােটর চালু করতে পৃথক একটি প্রাইম মুভার প্রয়ােজন হয়। প্রাইম মুভারের সাহায্যে রােটরকে সিনক্রোনাস গতিবেগে নিয়ে এসে ডি.সি. সরবরাহ প্রয়ােগ করলেই মােটর ম্যাগনেটিক লকিং (Magnetic Locking) হয়ে-সিনক্রোনাস গতিতে ঘুরতে শুরু করে। এক্ষেত্রে একটি 125V-250 ডি.সি. শান্ট ডাইনামাের অন্য প্রান্ত থেকে ডি.সি. সরবরাহ নিয়ে ব্রাশ ও স্লিপ রিং-এর মাধ্যমে রােটর টার্মিনালে প্রয়ােগ করা হয়। এ সময় ডাইনামাের সাহায্যে একই মেশিনকে প্রাইম
মুভার এবং এক্সাইটার হিসেবে চালানা যায়। সিনক্রোনাস মোটর পরিচালনা

ডাইনামােটি সিনক্রোনাস মােটরের শ্যাফটের সাথে সংযুক্ত করা থাকে। প্রথমে একে ডি.সি. মােটর হিসেবে চালানাে হলে তা প্রাইম মুভারের কাজ করে। যখন মােটর সিনক্রোনাস স্পিডে পৌছে, তখন ডাইনােমােটি ডি.সি, এক্সাইটার হিসেবে কাজ করে। এক পর্যায়ে সিনক্রোনাস মােটরটি পূর্ণ গতি নিয়ে চলতে শুরু করলে মােটরের কাপ্লিং-ক্লাচ (coupling-clutch) খুলে ডাইনামাের মােটর সাইড সিনক্রোনাস মােটর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয়। তা না হলে ডাইনােমােটি সিনক্রোনাস মােটরের লােড হিসেবে কাজ করায় অযথা অপচয় হয়। উপরােক্ত পদ্ধতি ছাড়াও সিনক্রোনাস মােটরের প্রাইম মুভার ও ডি. সি. এক্সাইটার হিসেবে যথাক্রমে পৃথক ইণ্ডাকশন মােটর এবং ডি.সি. শান্ট জেনারেটর ব্যবহার হতে পারে।

(৩) ড্যাম্পার ওয়াইণ্ডিং (Damper winding):

সিনক্রোনাস মােটরের স্যালিয়েন্ট পােলের অগ্রভাগ (উপরের অংশ) মােটা মােটা কপার, বার আড়াআড়িভাবে খাজের মধ্যে বসানাে থাকে। এদের দুই প্রান্ত তামার আংটা (Copper Ring) দ্বারা শর্ট করা থাকে। এ রিং-কে ড্যাম্পার ওয়াইন্ডিং বা এমাের্টাইজার (amortisseur)
বলে। এটি অনেকটা স্কুইরেল কেজ ওয়াইন্ডিং-এর ন্যায়। এ ড্যাম্পার ওয়াইন্ডিং প্রধানত দুটি কাজ করে :
(i) সিনক্রোনাস মােটরকে ইন্ডাকশন মােটর হিসেবে চালু হতে সাহায্য করে। এবং
(ii) সিনক্রোনাস মােটরের কলা-দোলন বা হান্টিং-এর মত ক্রটিকে প্রশমিত করে। সিনক্রোনাস মোটর

সিনক্রোনাস মোটরের বৈশিষ্ট্য গুলো হলঃ

(১) সিনক্রোনাস মােটর সর্বদা সিনক্রোনাস গতিবেগে চলে, ফলে এর স্পিড রেগুলেশন শূন্য।
(২) ওভার এক্সাইটেশনে পরিচালিত করে এটি পাওয়ার ফ্যাক্টর উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হয়।
(৩) সিনক্রোনাস মোেটর সেলফ স্টার্টিং নয়। অন্য কোন উপায়ে একে সিনক্রোনাস গতিবেগে বা এর কাছাকাছি কোন গতিবেগে ঘুরিয়ে দিতে হবে।
(৪) 50 HP থেকে 500 HP মােটর যাদের গতিবেগ 500 r.p.m-এর নিচে তাদের দক্ষতা ভাল হয়।

সিনক্রোনাস মােটর পরিচালনার মূলনীতি (Explain the Principle of Operation of Synchronous Motor):

সিনক্রোনাস মােটরে দুই ধরনের সরবরাহ প্রয়ােগ করা হয়-
১. রােটরে ডিসি সরবরাহ দেওয়া হয়।
২. স্টেটরে 30, এসি সরবরাহ প্রয়ােগ করা হয়।

দুই পােল বিশিষ্ট একটি সিনক্রোনাস মােটরের রােটরে ডিসি সরবরাহ দেওয়ায় রােটরে একটি স্থির চুক্ষক্ষেত্র তৈরি হয় এবং রােটরে সৃষ্ট পােল N ও S উপরের চিত্রে দেখানাে হলাে। আর স্টেটরে 3-0 এসি সরবরাহ দেওয়ায় এতে পরিবর্তনশীল চুম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। ধরা যাক এ, সি এর পজেটিভ অর্ধ সাইকেলে স্টেটর এক্সিস AB বরাবর উপরের (ক) নং চিত্রের ন্যায় Ns ও S, পােল সৃষ্টি হল। স্টেটুরে যেহেতু 3-, এসি সরবরাহ দেওয়া হয় সেহেতু Ns এবং S, পােল সিনক্রোনাস গতিতে ঘুরতে থাকে। ধরা যাক একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্টেটর এবং রােটর পােল AB এক্সিস বরাবর অবস্থান করছে। এই সময় রােটর N পােল স্টেটর Ns পােলের কাছে এবং রােটর S পােল স্টেটর Ns পোলের কাছে অবস্থান করে।

ফলে N ও Ns পােল এবং S ও Ns পোলের মধ্য বিকর্ষণ বল কাজ করে। সুতরাং রােটর পােল স্টেটর পােল হতে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরতে উদ্যত হয়। যা উপরের (ক) নং চিত্রে দেখানাে হলাে। 50Hz ফ্রিকুয়েন্সিতে পজেটিভ অর্ধ সাইকেল শেষে হওয়ার পর অর্থাৎ 10ms পর নেগেটিভ অর্ধ সাইকেলে স্টেটর Ns পপাল এবং Ss পপালের মধ্যে অবস্থানের পরিবর্তন হয়ে যায় যাহা উপরের (খ) নং চিত্রে দেখানাে হলাে। ফলে রােটরের N পােল স্টেটরের Ss পােল দ্বারা এবং রােটর S পােল স্টেটর Ns পােল দ্বারা আকর্ষিত হয়। সুতরাং রােটর পােল ঘড়ির কাঁটায় দিকে ঘুরতে চায় এবং মুহূর্তের মধ্যে এটা AB স্টেটার পােলের ন্যায় AB এক্সিস বরাবর অবস্থান করে।রােটরের উপর স্টেটরের এই আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ প্রায় একই সময়ে (10ms পরপর) হতে থাকে।

সিক্রোনাস মোটর পরিচালনা 

কিন্তু এত অল্প সময়ে রােটর তার স্থিতির জড়তা অতিক্রম করে স্টেটরের আকর্ষণ বা বিকর্ষণ কোন প্রকার বল দ্বারাই প্রভাবিত হয় না। শুধুমাত্র স্থির অবস্থায় কাঁপতে থাকে। উপরােক্ত আলােচনা থেকে দেখা যায় যে, সিনক্রোনাস মােটরের রােটর এবং স্টেটরে সরবরাহ দেওয়া সত্তেও এটি ঘুরতে পারে না। তাই বলা হয় সিনক্রোনাস মােটর সেলফ স্টার্টিং নয় । স্টেটর পােলদ্বয় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার মুহূর্তে যদি রােটর পােল এক পােল পিচ ঘুরিয়ে স্টেটর পােলের কাছে এনে দেওয়া যায় তাহলে স্টেটর ও রােটর পােলের মধ্যে চৌম্বকীয় সংযােগ (Magnetic Coupling) হয়ে। যায় ফলে স্টেটর পােলের সাথে রােটর পােলও সিনক্রোনাস গতিতে ঘুরতে থাকে যা উপরের (গ) নং চিত্রে দেখানাে হলাে।

সিনক্রোনাস মোটর ও অল্টারনেটরের মধ্যে পার্থক্য

সিনক্রোনাস মােটর

১। সিনক্রোনাস মােটর মাঝারি গতিবেগের উপযােগী করে তৈরি হয়।

২। সিনক্রোনাস মােটরে সাধারণত স্যালিয়েন্ট পােল রােটর ব্যবহার করা হয়।

৩। এ মােটুর ল্যাগিং, লিডিং ও ইউনিট পাওয়ার ফ্যাক্টরে পরিচালনা করা যেতে পারে।

৪। সিনক্রোনাস মােটরকে অল্টারনেটর, যান্ত্রিক লােড বহন, পাওয়ার ফ্যাক্টর উন্নতি, সিনক্রোনাস রিয়্যাক্টর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।।

৫। লােড হ্রাস বা বৃদ্ধি হলেও পুল আউট টর্কে না পৌছা পর্যন্ত এর গতিবেগ মােটামুটি স্থির থাকে।

অল্টারনেটর

১। অল্টারনেটরের গতিবেগ সাধারণত সিনক্রোনাস মােটরের চেয়ে বেশি হয়।

২। অল্টারনেটরে দু’রকম রােটর। যথা- (ক) স্যালিয়েন্ট পােল রােটর। (খ) সিলিন্ড্রাক্যাল রােটর ব্যবহার করা হয়।

৩। অল্টারনেটর ল্যাগিং, ইউনিটি ও লিডিং পাওয়ার ফ্যাক্টর লােডে পরিচালনা করা হলে জেনারেটেড ভােল্টেজ যথাক্রমে বেশি ও কম হয়ে থাকে।

৪। ‘অল্টারনেটর সাধারণত লােডে পাওয়ার সরবরাহ করে থাকে।

৫। লােড হ্রাস বা বৃদ্ধির সাথে সাথে (ল্যাগিং লােডে) টার্মিনাল ভােল্টেজের পরিবর্তন হয়।

রেফারেন্সঃ এসি মেশিনস-২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here